*পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল | লেখক ও গণমাধ্যম কর্মী

আজ ৪ নভেম্বর। বাংলা সাহিত্যের এক নিভৃতচারী অথচ দৃঢ়চেতা পথিকৃৎ কাজী ইমদাদুল হকের ১৪৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৮২ সালের এই দিনে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর গ্রামে এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে তাঁর জন্ম। যে সময়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, অন্যদিকে মুসলিম সমাজে কুসংস্কার, ফতোয়াবাজি ও শিক্ষা-বিমুখতা গ্রাস করে রেখেছিল, ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে যুক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। মাত্র ৪৪ বছরের জীবনে তিনি যা রচনা করেছেন, তা আজ শত বছর পরেও আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনায় সমান প্রাসঙ্গিক।
এক ‘আবদুল্লাহ’তেই অমরত্ব
কাজী ইমদাদুল হকের নাম উচ্চারিত হলেই প্রথমে আসে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’র কথা। ১৯৩৩ সালে মৃত্যুর পর প্রকাশিত এই উপন্যাসটি বাংলা মুসলিম সমাজের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও শিল্পসার্থক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। এই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ধর্মের নামে প্রচলিত কুসংস্কার, পীর-পূজা, অলৌকিকতায় বিশ্বাস একটি সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজকে পিছিয়ে দেয়। উপন্যাসের নায়ক আবদুল্লাহর মধ্য দিয়ে তিনি মূলত নিজের আত্মজীবনী ও আদর্শকেই তুলে ধরেছেন— যে শিক্ষিত, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল হতে চায়, কিন্তু সমাজ তাকে বারবার পেছনে টানে। আজকের বাংলাদেশে যখন আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে, ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে, বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে বিতর্ক করছি, তখন আবদুল্লাহর দ্বন্দ্ব যেন আমাদের সকলের দ্বন্দ্ব।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আল-এছলাম’ ও ভূগোল বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক, যা তৎকালীন সময়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য যুগান্তকারী ছিল।
শিক্ষক থেকে শিক্ষা-প্রশাসক: এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
কাজী ইমদাদুল হক ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক ও সফল শিক্ষা-সংগঠক। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০০ সালে বিএ পাশ করার পর তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন (১৯০৪)। পরে শিলং, ঢাকা মাদ্রাসা, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভূগোলের অধ্যাপক (১৯১১), মুসলিম শিক্ষা বিভাগের সহকারী স্কুল পরিদর্শক (১৯১৪), কলকাতা ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক (১৯১৭) এবং সর্বশেষ সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট (১৯২১) হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দক্ষতা ও সততার স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯১৯ সালে ‘খান সাহেব’ ও ১৯২৬ সালে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মভূমি পাইকগাছায় ‘কাজী ইমদাদুল হক স্মৃতি পরিষদ’ দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ বুধবার সকালে নতুন বাজার চত্বরে তাঁর আবক্ষ মূর্তিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, স্মরণসভা, আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ। স্মৃতি পরিষদের সভাপতি প্রকাশ ঘোষ বিধানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি থাকবেন পাইকগাছা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শংকর প্রসাদ দত্ত। বিশেষ অতিথি থাকবেন অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম কচি ও লেখক মনিরুল ইসলাম সিদ্দিকী (ফিরোজ)।
তবে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় তাঁকে স্মরণ করলে চলবে না। এখানেই গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা। পাইকগাছার গর্ব এই মনীষীর নামে আজও একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র বা জাতীয় পর্যায়ের সাহিত্য পুরস্কার গড়ে ওঠেনি। গদাইপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণ ও একটি আধুনিক পাঠাগার স্থাপন এখন সময়ের দাবি। তাঁর ‘মুক্তবুদ্ধি ও শিক্ষাই মুক্তির পথ’- এই দর্শনকে যদি নতুন প্রজন্মের পাঠ্যপুস্তকে ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে না দেওয়া যায়, তবে এই স্মরণসভা কেবল লোক দেখানো হয়ে থাকবে।
১৯২৬ সালের ২০ মার্চ কলকাতায় মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর আদর্শ মরে যায়নি। আজকের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, নৈতিক অবক্ষয় ও অন্ধ অনুকরণের যুগে দাঁড়িয়ে কাজী ইমদাদুল হক আমাদের শেখান- কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। এটাই হোক এবারের জন্মবার্ষিকীর অঙ্গীকার।



