ধীরে ধীরে আবহমান বাঙালির গ্রামীণ ঐতিহ্য উঠে গেল। বাংলা নববর্ষের মূল চেতনা থেকে দূরে সরে গেল। হাইজ্যাক হয়ে গেল নববর্ষের প্রকৃত সংস্কৃতি। চালু হলো বৈশাখী মেলায় পান্তা-ইলিশ খাবার অপসংস্কৃতি। অনেকে অনেকভাবে আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে বিকৃত করার চেষ্টা করলেন।এখনও করছেন। সুযোগে সদ্বব্যবহার করতে অনেকে মাঠে নেমেছেন। এ যেন ঝড়ে আম পড়ে। ফকিরের কেরামতি বাড়ে। সেরকম একটি অবস্থা।
এই সুযোগে সুকৌশলে এক শ্রেণির মুসলিম নামধারী ইসলাম বিদ্বেষী,দেশদ্রোহিরা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। তারা নববর্ষের মূল সংস্কৃতিকে হাইজ্যাক করে নেয়। মিশে যায় বাবু কেদ্রিক কালচারে। তারা শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রা,কপালে তিলক দেয়া,সর্বাঙ্গে বাঘ,ভল্লুক,পেঁচা,ময়ুর,টিয়া,কুমিরের প্রতিকৃতি বহনের সংস্কৃতি। এসব প্রতিকৃতি বহনের সংস্কৃতির সাথে বৈদান্তিক চিন্তা-চেতনা জড়িয়ে আছে।
এখন হাটে-বাজারে হালখাতার দৃশ্য তেমন একটা চোখে পড়ে না। পহেলা বৈশাখ যে চেহায়ায় বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ও কিছু শহারাঞ্চলে উদযাপিত হয় তার সঙ্গে আমাদের গ্রাম-গঞ্জের চাষা-ভূষা,শ্রমিক-মজুর প্রমুখের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের কোন সংযোগ নেই। এই বিলাসের মধ্য দিয়ে বরং প্রতি বছর আমাদের প্রকৃত জীবনাচরনের প্রতি একটা বিদ্রুপই ছুঁড়ে দেয়া হয়। এই জাতীয় কৃত্রিম একটি উৎসবের জন্ম কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু কালচার থেকে। আর তার পৃষ্টপোষক ছিলেন গ্রাম ছেড়ে শহুরে ভোগবিলাসের লোভে কলকাতায় পাড়ি জমানো গ্রাম্য রাজা-জমিদাররা।
বাঙালির চিরায়িত সংস্কৃতি নববর্ষ এখন দেখে মনে হয় বাঙালি সংস্কৃতি নয়। বাঙালিত্বের কোন উৎসব নেই। চলে গেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। একাকার হয়ে গেছে ভিন্ন ধর্মালম্বীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা,কপালে তিলক দেয়া,সর্বাঙ্গে বাঘ,ভল্লুক,পেঁচা,ময়ুর,টিয়া,কুমিরের প্রতিকৃতি বহন করা এক ভিন্ন কৃষ্টি সভ্যতার সাথে। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে পশু পূজনের কোন অনুমোদন নেই। কারণ এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ মনে করেন পশুর মুখোশ,জন্তু শোভাযাত্রা হিন্দুত্ববাদের ধারণা থেকে উদ্ভুত।
হিন্দুত্ববাদের অনুকরনে এই ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের কী সর্ম্পক? যদিও হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসীদের ধারণা তারাই একমাত্র ‘বাঙালি’। খাঁটি বাঙালি। বাকি সবাই বহিরাগত। অনার্য। খেজুরতলা থেকে আগত।
তবে ইতিহাস কখনই সে কথা বলে না। ইতিহাস বলে বাংলা সাহিত্য বা বাঙালিত্ব বলতে যা কিছু বোঝায় এককভাবে এই তল্লাটের মুসলমানদের অবদান। বাংলা নববর্ষের উদ্ভাবক মুগল সম্রাট আকবর। তাঁর ‘তারিক-ই-ইলাহী’ বা ফসলি সনের কথা এখন আর কারো মনে আছে বলে মনে হয় না। ব্যবসায়িদের নতুন হালখাতার কথাও স্মরণ নেই। টাকা আদায়ের লালপেড়ে মোটা বাইন্ডিং খাতাও দৃশ্যত তেমন একটা নজরে আসে না। অতি প্রগতি সাজতে যেয়ে সবই চলছে নতুন ভড়ং-এ। বিদেশী সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে।
বাঙালিদের শত শত বছরের দেশজ কৃষ্টি সভ্যতা তমদ্দুন রয়েছে। স্বাতন্ত্র্য মন্ডিত জীবনধারা রয়েছে। তাদের বেঁচে থাকতে হবে কাউকে অনুকরণ করে নয়। কারো দয়াপরবেশে নয়। নিজস্ব চেতনায় আগামীর প্রত্যাশার এগিয়ে যেতে হবে। একেবারেই নিজস্ব জীবনাচরণ থেকে এসব উৎসবের আয়োজন করতে হবে। যে উৎসবের আয়নায় লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত ৬৮ হাজার গ্রাম বাংলার অবয়ব ফুটে ওঠে। বাঙালিত্ব,ইতিহাস-ঐতিহ্য,কৃষ্টি সভ্যতা ফুটে উঠবে।
কার্যত ১লা বৈশাখে ইলিশ-পান্তা,শঙ্খ ধ্বণীর উচ্ছাস একটি অপসংস্কৃতি। নববর্ষের নামে শুরু হয়েছে ভিন্ন মোড়কে ঠাণ্ডা মাথায় নতুন করে এক রাজনীতি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপরাজনীতি। জোর করে চেপে দেয়া এক আত্নঘাতি সংস্কৃতি। ধরে নিতে পারেন এসব চক্রান্ত আগামীর জন্য দেশ-জাতির বিরুদ্ধে এক অশনি সংকেত। নববর্ষের নামে শুরু হয়েছে ভিন্ন মোড়কে ঠাণ্ডা মাথায় নতুন করে আর এক রাজনীতি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপরাজনীতি।




