কেউ ছোট নন, কেউ পবিত্রও নন | বিপ্লব, ক্ষমতা ও দুর্নীতির বৃত্তে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বহুবার। শাসক বদলেছে, রাজনৈতিক স্লোগান বদলেছে, নতুন মুখ এসেছে—কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতির কাঠামো কতটা বদলেছে? এই প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে।
১. ক্ষমতার পরিণতি| দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে একটি সরকার বা রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। জবাবদিহি দুর্বল হলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতাও বাড়তে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতা থেকে বিদায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক বাঁক। এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়।
২. বিপ্লব কার? ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূলে কি শুধু কয়েকজন ছাত্র ছিলেন? নিশ্চয়ই ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু রাস্তায় নেমেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষও। তাই এই পরিবর্তনকে কেবল কোনো একটি গোষ্ঠীর একক অর্জন হিসেবে দেখলে বৃহত্তর জনসম্পৃক্ততাকে খাটো করা হয়। একই সঙ্গে এই পরিবর্তনের পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো প্রভাব ছিল কি না—এ নিয়েও নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসই করবে।
৩. নতুন মুখ, পুরনো রোগ? ৫ আগস্টের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি সত্যিই বদলেছে? আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অনৈতিক সুবিধা নেয়, দুর্নীতি বা লুটপাটে জড়ায়, তাহলে তার দায় পুরো আন্দোলনের ওপর চাপানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগগুলোকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও উচিত নয়। রাজনীতিতে অশ্লীল ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি এবং প্রতিপক্ষকে অসম্মান করার সংস্কৃতি যদি চলতেই থাকে, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?
৪. রাতারাতি সম্পদের মালিক—প্রশ্ন উঠবেই, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে যাদের দৃশ্যমান আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত, তাদের কেউ যদি অস্বাভাবিক দ্রুততায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে: সেই সম্পদের উৎস কী?
এ ধরনের অভিযোগ থাকলে তার উত্তর গুজব বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আসা উচিত। নইলে জনগণ প্রশ্ন করবেই—এটা কি সত্যিকারের পরিবর্তন, নাকি শুধু ক্ষমতা ও সুবিধাভোগীদের পালাবদল?
৫. বিপ্লবের একক মালিকানা নেই, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এককভাবে একটি গণআন্দোলনের মালিকানা দাবি করা উচিত নয়। এই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক দেখা যায়। তাই গণআন্দোলনকে দলীয় বা গোষ্ঠীগত সম্পত্তিতে পরিণত করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। ২০২৪-এর আন্দোলন যদি ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণে গড়ে উঠে থাকে, তাহলে তার কৃতিত্বও সম্মিলিতভাবেই দেখতে হবে।
৬. মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসন দেখেছে, বিএনপির শাসন দেখেছে, জাতীয় পার্টির শাসন দেখেছে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দেখেছে। দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকাও জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে। দল ও নেতৃত্ব বদলেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেছে—রাজনৈতিক চরিত্র ও শাসনব্যবস্থার সংস্কৃতি কতটা বদলেছে? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতা, প্রভাব বা সুযোগ হাতে এলে সেই নীতির পরীক্ষা শুরু হয়।
৭. অরাজকতা গণতন্ত্র নয়, বিপ্লব বা আন্দোলনের পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার দেয় না। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকবে, সভা-মিছিল থাকবে, তর্ক-বিতর্ক থাকবে—এগুলো গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু গালিগালাজ, মারামারি, হুমকি, দখলদারিত্ব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক আচরণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিচয় নয়, আইনের শাসনই শেষ কথা হওয়া উচিত।
৮. সমস্যার শিকড় কোথায়? আমাদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসাতে না পারা এবং প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির অধীন করে ফেলা। দুর্নীতি শুধু রাজনীতিবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে যখন অনৈতিক সুবিধা নেওয়াকে স্বাভাবিক মনে করা হয়, তখন শুধু সরকার পরিবর্তন করে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়।
প্রশ্নটি তাই শুধু—“কে দুর্নীতিবাজ?” নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি কি, যেখানে দুর্নীতি করলে পরিচয় বা ক্ষমতা নির্বিশেষে শাস্তি নিশ্চিত হবে?
৯. শেষ কথা: ব্যক্তি নয়, সিস্টেম বদলাতে হবে দুর্নীতির লাগাম টানা না গেলে স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হবে না। আর গণতন্ত্রও শুধু নির্বাচন ও স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কেউ ছোট নন। আবার কেউ প্রশ্নের ঊর্ধ্বেও নন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রনেতা কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি—যেই হোক, রাষ্ট্রের আইন ও জনগণের কাছে সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। এখনও সময় আছে। সিস্টেমের মধ্যে থেকেই সম্মিলিতভাবে দুর্নীতিকে “না” বলতে হবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
তা না হলে এত ত্যাগ, এত আন্দোলন এবং এত প্রত্যাশার পরও একদিন প্রশ্ন উঠবে— এই পরিবর্তন কি সত্যিই সফল হয়েছিল?




