spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

“জীবন্ত প্রতিচ্ছবি আলোকবর্তিকা হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী”

🌲পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল

👉কালপ্রবাহের অনবদ্য নিয়মে পৃথিবীর বুক থেকে কত নদী শুকিয়ে যায়, কত নক্ষত্র ঝরে পড়ে গহন আঁধারে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা সময়ের সীমারেখা অতিক্রম করে অমর হয়ে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, তাঁদের কর্মে, চিন্তায় এবং মহৎ আদর্শে। তাঁরা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ হয়েও জীবনদর্শনের আলো ছড়িয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করেন। তেমনি একজন কালজয়ী পুরুষ, ক্ষণজন্মা শিক্ষাবিদ, নীতি ও সততার অনন্য প্রতীক ছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সফল প্রধান শিক্ষক মরহুম হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী স্যার।

আজ তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর (৫ কার্তিক ১৪১৯ বাংলা) শারদীয় হেমন্তের এক সুপ্রভাতে, সকাল ৭:০৩ মিনিটে ৭৮ বছর বয়সে তিনি পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত জটিলতা শেষে তাঁর প্রয়াণে সমগ্র পাইকগাছা তথা উপকূলীয় অঞ্চলে নেমে এসেছিল গভীর শোকের ছায়া। দেখতে দেখতে চোদ্দটি বসন্ত পার হয়ে গেল, কিন্তু তাঁর স্মৃতির দীপ্তি এতটুকু ম্লান হয়নি। খুলনা জেলার কপোতাক্ষ ও শিবসা নদীর পলিবিধৌত এই পল্লি-জনপদের প্রতিটি ধূলিকণা, পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট-পাথর এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে তিনি আজও একইভাবে জীবন্ত, একইভাবে ভাস্বর।
আমাদের সমাজে শিক্ষকের অভাব নেই, কিন্তু ‘শিক্ষাগুরু’ বা ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলতে যা বোঝায়, আমজাদ আলী স্যার ছিলেন ঠিক তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। উনার জ্যেষ্ঠ পুত্র, গুণী আইনজীবী ও সমাজসেবক অ্যাডভোকেট মোঃ মাফতুন আহমেদ ভাইয়ের বিশেষ অনুরোধে এবং স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দীর্ঘ স্মারক নিবন্ধটি রচনার প্রয়াস পেলাম। আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের স্মৃতিপটে স্যার যেভাবে অমলিন হয়ে আছেন, সাহিত্যিক অনুভূতির আল্পনায় সেই স্মৃতি ও ইতিহাসকেই আজ নতুন করে মেলে ধরছি।

১. নদীঘেরা জনপদের এক নক্ষত্রের উদয়: জন্ম, শিক্ষা ও সংগ্রাম

দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক উর্বর জনপদ পাইকগাছা ও কয়রা। ১৯৩৫ সালের ২রা জুলাই, অবিভক্ত পাইকগাছা (বর্তমান কয়রা) উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাগালী ইউনিয়নের ‘বাগালী’ গ্রামে এক সম্রান্ত ও বুনিয়াদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আমজাদ আলী। কপোতাক্ষ নদীর কুলঘেঁষা সেই গ্রামটি তখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে শান্ত হলেও আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার আলো থেকে ছিল অনেকটাই বঞ্চিত।
তৎকালীন সময়ে বঙ্গঞ্চলের উপকূলীয় পল্লী এলাকায় পড়াশোনা করাটা ছিল এক মহাসংগ্রামের মতো। কাঁচা মেঠো পথ, নদী-নালার প্রতিবন্ধকতা, আর যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম অনুন্নত পরিবেশ অতিক্রম করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। কিন্তু বাল্যকাল থেকেই আমজাদ আলীর মেধা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং শিক্ষার প্রতি যে অনুরাগ দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ছিল সাধারণ আর দশটা শিশুর চেয়ে আলাদা।
প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল পাইকগাছা উপজেলার লক্ষ্মী খোলা গ্রামে।
স্থানীয় আত্মীয় কাগজী বাড়িতে থেকে মক্তাবে মেধার স্বাক্ষর রেখে সেখানে প্রাথমিক গণ্ডি শেষ করে ১৯৪৫ সালে তিনি ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে।

তখনকার দিনে হাইস্কুলে ভর্তি হওয়া এবং টিকে থাকা অত্যন্ত দুরুহ ব্যাপার ছিল। বহু মাইল পথ পায়ে হেঁটে, বর্ষায় কাদা-জল পেরিয়ে তিনি স্কুলে যেতেন। ১৯৫১ সালে এই স্কুল থেকেই কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা (মেট্রিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

মেট্রিক পাসের পর তাঁর শিক্ষার তৃষ্ণা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় দূরবর্তী খুলনা শহরের বিখ্যাত দৌলতপুর বি.এল. কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে তিনি সাফল্যের সাথে আই.এ (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন এবং ১৯৫৮ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই যুগে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা মানেই ছিল তৎকালীন সিভিল সার্ভিস বা প্রশাসনের উচ্চপদে আসীন হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। অর্থ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মোহ যে কাউকেই আকর্ষণ করতে পারত। কিন্তু আমজাদ আলী স্যার বেছে নিয়েছিলেন এক ভিন্ন পথ—আলোকিত সমাজ গড়ার পথ, নিঃস্বার্থ জ্ঞান বিতরণের পথ।
শিক্ষকতাকে নিছক পেশা নয়, বরং ‘ব্রত’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পরবর্তী ১৯৭৪ সালে তিনি খুলনা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে সি.ইন.এড অর্থাৎ বিএড অর্জন করেন।
এবং তারপর রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে অতি উচ্চ নম্বরে মাস্টার্স ইন এডুকেশন (এম.এড) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ১৯৯১ সালে। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পেছনে তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

২. কর্মজীবন ও পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: একটি সোনালী যুগ

১৯৬০ সালে তরুণ আমজাদ আলী পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সূচনা এখান থেকেই। এর পর থেকে একটানা তিন দশকেরও বেশি সময় তিনি এই বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং শৃঙ্খলার মান উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে গেছেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের আসন অলঙ্কৃত করেন।
আমজাদ আলী স্যারের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন সময়টিকে পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসের “সোনালী যুগ” বললে এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে না। একটি সাধারণ গ্রামীণ স্কুলকে প্রশাসনিক সততা, একাডেমিক সাফল্য এবং শৃঙ্খলার দিক থেকে তিনি জাতীয় পর্যায়ের সমকক্ষ করে তুলেছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরবর্ন্তী সময়ে দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এই বিদ্যালয়টিও অবকাঠামোগতভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যুদ্ধোত্তর সেই চরম সংকটের দিনে বিদ্যালয়ের হাল ধরেছিলেন আমজাদ আলী স্যার। ভাঙাচোরা ঘর মেরামত করা, বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের আবার ক্লাসে ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন।
বিদ্যালয়ের আঙিনায় তিনি নানা প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন। পরিবেশবান্ধব সুন্দর প্রাঙ্গণ তৈরিতে তাঁর নিজস্ব নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্লাসে সঠিক সময়ে উপস্থিতি, নিয়মকানুন মেনে চলা এবং পরীক্ষার খাতায় নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি কোনো আপস করতেন না। স্যারের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাস করা হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, মেডিক্যাল কলেজসহ দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থান করে নেয় এবং সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে আসীন হয়।

৩. স্মৃতিপটে ভেসে ওঠা দিনগুলি: একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির কোলাজ

আমার নিজ বাড়ি পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অত্যন্ত নিকটস্থ ‘সরল’ গ্রামে। সরল গ্রামটি বিদ্যালয়ের এতই কাছে যে, প্রতিদিন স্কুলের ঘণ্টার শব্দ, অ্যাসেম্বলির জাতীয় সংগীত আর মাঠে ছাত্রদের কোলাহল আমাদের বাড়িতে বসেই স্পষ্ট শোনা যেত। এই ভৌগোলিক নৈকট্য এবং পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে অত্যন্ত ছোটবেলা থেকেই আমি আমজাদ আলী স্যারকে খুব কাছ থেকে দেখার, জানার ও অনুধাবন করার বিরল সুযোগ পেয়েছিলাম।
আমি যখন পাইকগাছা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে (যা বর্তমানে ২৩ নং মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়) পড়ালেখা করতাম, তখনকার একটি ছোট্ট কিন্তু হৃদয়স্পর্শী স্মৃতি আজও আমার মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। স্কুলটি ছিল হাইস্কুলের ঠিক মুখোমুখি। প্রতিদিন আমরা প্রাইমারি স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাইস্কুলের বড় বড় ভাইদের দৌড়ঝাঁপ ও স্যারদের গাম্ভীর্যপূর্ণ হাঁটাচলা দেখতাম।
একদিনের কথা খুব স্পষ্টভাবে মনে পড়ে। দুপুরের টিফিনের সময় প্রাইমারি স্কুলের সামনে সন্তোষ দা ঝালমুড়ি আর ভাঁজাবাদাম বিক্রি করছিলেন। আমরা কয়েকজন শিশু লোভাতুর চোখে সন্তোষ দার ঝালমুড়ির ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এমন সময় পাইকগাছা সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, গম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী আমজাদ আলী স্যার সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। স্যারের গায়ে ছিল পরিপাটি পোশাক, চোখে চশমা, আর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ।
হঠাৎ স্যার আমার সামনে এসে থামলেন। পকেট থেকে টাকা বের করে সন্তোষ দাকে বললেন আমাকে এক প্যাকেট গরম বাদাম দিতে। এরপর আমার মাথায় তাঁর স্নেহধন্য ডানহাতটি রেখে অতি মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবু, কেমন আছো? মা কেমন আছে? বাবা কেমন আছে? বাড়ির সবাই ভালো আছে তো?”
ঐ অতি সাধারণ একটি মুহূর্ত, কিন্তু একজন পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষকের সেই স্পর্শ আর স্নেহমাখা কণ্ঠস্বর আমার খুদে হৃদয়ে এক অসামান্য প্রভাব ফেলেছিল। সেই কোমল হাতটির স্পর্শ আজও যেন আমার মাথায় অনুভব করি, আজও স্মৃতিপটে ভেসে উঠলে চোখ দুটো ভিজে ওঠে আবেগে। স্যার কেবল একজন বড় শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন অভিভাবকতাতুল্যা এক পরম আশ্রয়।
আমাদের পরিবারের সাথে, বিশেষ করে আমার বাবা এবং জ্যাঠামশাইদের সাথে আমজাদ আলী স্যারের অত্যন্ত সুদৃঢ়, গভীর ও হৃদ্যতাপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সেই বন্ধন ছিল অকৃত্রিম।
পরবর্তীতে প্রাইমারি গণ্ডি পেরিয়ে আমি পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। স্যার যখন প্রধান শিক্ষক, তখন প্রায় আড়াই বছর তাঁর সরাসরি ছাত্র হওয়ার মহতী সুযোগ আমার ঘটেছিল। ক্লাসে স্যার যখন ঢুকতেন, থমথমে নীরবতা নেমে আসত। কিন্তু তিনি যখন পড়ানো শুরু করতেন, তখন জটিল থেকে জটিলতম বিষয়টিও জলের মতো সহজ হয়ে যেত। পড়াশোনার বিষয়ে স্যার ছিলেন মারাত্মক কঠোর, কোনো ফাঁকিবাজি তিনি সহ্য করতেন না। ‘পড়াশোনায় কোনো ছাড় নয়’—এটিই ছিল তাঁর মূল নীতি। কিন্তু ক্লাসের বাইরে তিনি ছিলেন এক মমতাময় পিতা।
১৯৯২ সালের ১লা জুলাই স্যার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যান। এর পর ১৯৯৫ সালে যখন আমি মেট্রিক (এসএসসি) পাস করি, তখনও স্যারের সাথে আমার ঘন ঘন দেখা হতো। পাইকগাছা বাজারের রাস্তায় বা স্কুলের সামনের পথ দিয়ে স্যার যখন হেঁটে যেতেন, আমি ছুটে গিয়ে সালাম দিতাম। স্যার হাসিমুখে দাঁড়াতেন, আমার পড়াশোনা ও পরিবারের খোঁজখবর নিতেন। পরম স্নেহে উপদেশ দিতেন কীভাবে ভবিষ্যতে ভালো মানুষ হতে হবে। সেই স্মৃতিগুলো আমার জীবনের অন্যতম সেরা সম্পদ।

৪. বিদায়বেলার অশ্রুজল ও এক যুগান্তকারী শিক্ষাদর্শন

১৯৯২ সালের ১লা জুলাই ছিল পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক পরম করুণ ও আবেগময় দিন। সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে স্যার সেদিন বিদায় নিচ্ছিলেন। বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজন করা হয়েছিল এক বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
সেদিনের সেই আবেগঘন পরিবেশের কথা যারা প্রত্যক্ষ করেছে, তারা কখনোই তা ভুলতে পারবে না। মাইকে যখন শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মানপত্র পাঠ করা হচ্ছিল, তখন পুরো মাঠজুড়ে নেমে এসেছিল নিস্তব্ধতা। অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই শুরু হলো কান্না। শত শত ছাত্র-ছাত্রী, সহকর্মী শিক্ষক, কর্মচারী এবং এলাকার সাধারণ মানুষ অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করল।
একজন শিক্ষক কতটা ভালোবাসার পাত্র হলে, কতটা জনবান্ধব এবং সার্বজনীন হলে মানুষ এমনভাবে অঝোর নয়নে কাঁদতে পারে, সেদিনের বিদায় অনুষ্ঠানটি ছিল তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। শিক্ষার্থীরা তাদের পরম শিক্ষককে ছাড়তে চাইছিল না, শিক্ষকরা হারিয়ে ফেলছিলেন তাঁদের অভিভাবককে। স্যার নিজেও সেদিন অশ্রুসংবরণ করতে পারেননি। ভিজে যাওয়া চোখে সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় কর্মস্থলকে।
আমজাদ আলী স্যারের শিক্ষাদর্শন ছিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও আধুনিক। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের হাতিয়ার নয়; শিক্ষা হলো মানুষের ভেতরের নৈতিকতা, সততা ও সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটানোর মাধ্যম। তিনি ছাত্রদের বলতেন, “আগে ভালো মানুষ হও, তারপর ভালো ছাত্র বা বড় কর্মকর্তা হও।”
তিনি যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি প্রয়োজনবোধে কঠোর শাসনও করতেন। কোনো ছাত্র অন্যায় করলে কিংবা পড়াশোনায় অবহেলা করলে তিনি শাসন করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কিন্তু সেই শাসনের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবল সন্তানতুল্য ছাত্রকে সঠিক পথে চালিত করার তাগিদ। আজও তাঁর সেই নীতি-আদর্শ মান্য করে চলেন তাঁর হাজার হাজার শিক্ষার্থী, যাঁরা আজ দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

৫. জনবান্ধব, জনকল্যাণমুখী ভাবমূর্তি ও সংবাদপত্রের প্রাণপুরুষ

স্যার কেবল শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসেবক, চিন্তাবিদ এবং আধুনিক পাইকগাছা গড়ার অন্যতম কারিগর। পাইকগাছা পৌরসভার বাতিখালী ৮ নং ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে এলাকার প্রতিটি সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রশংসনীয়। রাস্তাঘাট নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং এলাকার দরিদ্র মানুষের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি তথ্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। এই চিন্তা থেকেই তিনি সংবাদপত্রের জগতে পা রাখেন। খুলনা থেকে প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত ঐতিহ্যবাহী ‘আজাদ বার্তা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ ছিলেন হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকারের কথা তুলে ধরতে এই পত্রিকাটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
স্যারের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি ও মহান কর্মকে স্থায়ীরূপ দিতে এবং এলাকার নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতি অনুরাগী করে তুলতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘হেডমাস্টার আমজাদ আলী পাবলিক লাইব্রেরি ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। এটি বর্তমানে এলাকার শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ‘দ্য ইন্টার মিডিয়া গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স (প্রাঃ) লিঃ’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর দিকনির্দেশনা ও আশীর্বাদ ছিল প্রধান উৎস।
স্যারের বড় ছেলে, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসেবক অ্যাডভোকেট মোঃ মাফতুন আহমেদ এবং ছোট ছেলে সহকারী শিক্ষক মোঃ ইকবাল আহমেদ
উভয়েই পিতার রেখে যাওয়া সততা, নীতি এবং জনকল্যাণমূলক আদর্শকে ধারণ করে সমাজসেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। এটি প্রমাণ করে, আমজাদ আলী স্যার কেবল স্কুলেই নয়, নিজের পরিবারেও সুশিক্ষা ও নৈতিকতার এক সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন।

৬. আদর্শ শিক্ষকের কালজয়ী বৈশিষ্ট্য: শাসন ও স্নেহের সুষম মেলবন্ধন

আজকের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ধরণ অনেকটাই বদলে গেছে। কিন্তু আমজাদ আলী স্যারের যুগের শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে ছিল এক গভীর আত্মিক টান। স্যারকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মৌলিক দিক ফুটে ওঠে:

১. কঠোর শৃঙ্খলা ও নীতির অনুশাসন:

স্কুলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিতি এবং ক্লাসের পড়া তৈরি রাখা ছিল বাধ্যতামূলক। শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি ছিলেন আপসহীন।

২. নিরহংকার ও সাধারণ জীবনযাপন:

অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ও পদমর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও স্যারের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সাদা-সিধে ও সাধারণ। সুতির সাধারণ পোশাক, পায়জামা-পাঞ্জাবি বা শার্ট পরিধান করতেন, চশমা চোখে হেঁটে যেতেন রাস্তায়। অহংকার বা কৃত্রিমতা তাঁর ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি।

৩. অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনা:

স্যার ছিলেন একজন খাটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম, কিন্তু একই সাথে অত্যন্ত অসাম্প্রদায়িক চিন্তার অধিকারী। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের তিনি সমান চোখে দেখতেন এবং সবাইকে এক সুতোয় বাঁধার শিক্ষা দিতেন।
৪. নিরপেক্ষ ও সৎ প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব:

শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের তহবিল পরিচালনা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি সততা ও স্বচ্ছতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। লোভ বা প্রলোভন তাঁকে কখনো কাবু করতে পারেনি।
৭. রূপক ও সাহিত্যে স্যার আমজাদ আলী:

একটি বটবৃক্ষের উপমা
যদি রূপকের আশ্রয়ে স্যারকে ব্যাখ্যা করতে হয়, তবে হেডমাস্টার আমজাদ আলী ছিলেন এক প্রকাণ্ড, স্নিগ্ধ বটবৃক্ষের মতো। রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা তপ্ত উপকূলীয় জনপদে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর শীতল ছায়া। কত শত পথশ্রান্ত পথিক, কত হাজারো জ্ঞানপিপাসু বালক তাঁর সেই ছায়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছে, জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছে, আর মেধা সমৃদ্ধ করে ডানা মেলে উড়ে গেছে দূর থেকে দূরান্তে।
তিনি ছিলেন এক দক্ষ মালী। পাইকগাছা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় রূপী বাগানটিতে তিনি পরম মমতায় একের পর এক কচি চারা রোপণ করেছিলেন। নিজের ঘাম ও মেধা দিয়ে সেই চারাগুলোকে পানি সিঞ্চন করে বিশাল মহীরুহে পরিণত করেছিলেন। আজ সেই বৃক্ষগুলো ফুল ও ফলে সুশোভিত হয়ে দেশকে সেবা দিচ্ছে। মালী হয়তো আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর বাগানের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

কবি কায়কোবাদের ভাষায় বলতে হয়:
“যেদিন নিভিবে মোর জীবনের বাতি,
সেদিন বুঝিবে সবে কি ছিল গো সাথী।”

আমজাদ আলী স্যার বেঁচে থাকতে আমরা হয়তো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি আমরা কত বড় এক ছায়াবৃক্ষকে পাশে পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পর, আজকের সমাজের নীতিহীনতা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে তাকালে প্রতি মুহূর্তে আমরা অনুভব করি—আমজাদ আলী স্যারের মতো একজন নীতিবান শিক্ষকের কতটা প্রয়োজন ছিল আজ!

৮. উপসংহার:
বিনম্র শ্রদ্ধা ও অমরত্বের প্রত্যাশা

মানুষের জীবননদী একদিন না একদিন শুকিয়ে যায়। কিন্তু কর্মের মাধ্যমে যে মানুষ অমরাবতী লাভ করে, তার প্রয়াণ কেবল শারীরিক। হেডমাস্টার মোহাম্মদ আমজাদ আলী স্যার শারীরিক অবয়বে আমাদের মাঝে নেই সত্যি, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর হাজার হাজার ছাত্রের আদর্শে, তিনি বেঁচে আছেন পাইকগাছার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইটে, তিনি বেঁচে আছেন ‘আজাদ বার্তা’র পাতায় এবং হাজারও মানুষের হৃদয়ের গভীরে।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভাষায়:
“সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে,
মনের মন্দিরে নিত্য সেবে সর্বজন।”

আমাদের হেডমাস্টার আমজাদ আলী স্যার ছিলেন সেই ধন্য পুরুষ, যাকে পাইকগাছার মানুষ কখনো ভুলবে না। মনের মন্দিরে শ্রদ্ধার আসনে তিনি চিরদিন আসীন থাকবেন।
আজ তাঁর ১৪তম প্রয়াণ দিবসে আমরা অত্যন্ত আকুল হৃদয়ে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি—হে পরম দয়ালুময়, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সমাজসেবক ও আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আমজাদ আলী স্যারকে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ স্থান দান করুন। তাঁর জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাঁকে শান্তির নীড়ে রাখুন।
আমরা তাঁর দেখানো সততা, আদর্শ, নীতি ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক পথ ধরে যেন বাকী জীবন চলতে পারি—আজকের দিনে এটিই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার।
হে মহান শিক্ষক, আপনাকে শত কোটি বিনম্র প্রণাম ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি! আপনি চিরঞ্জীব, আপনি অমর!

লেখক :পূর্ণ চন্দ্র মন্ডল, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।

Please follow and like us:
অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ
অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ
## সম্পাদক ও প্রকাশক **অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ** একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, লেখক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘদিন ধরে খুলনা বারে সুনামের সঙ্গে আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। সমাজ, ইতিহাস, আইন, মূল্যবোধ ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর **১০৬টিরও বেশি গ্রন্থ** প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত। সত্য, নির্ভুলতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি **আজাদ বার্তা**-এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে একটি স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছেন। পাশাপাশি **আজাদ টিভি** এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষা, জনসচেতনতা ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান অব্যাহত রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে **আজাদ বার্তা** নির্ভীক, দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পাঠকের আস্থা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ### উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ * শনির কবলে বাংলাদেশ * ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বৃহত্তর খুলনা * অপসংস্কৃতির ভয়াল থাবা * জনতার জবানবন্দী * একটি অবিস্মরণীয় নাম খান-এ-সবুর * জিন্নাহ কি দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রবক্তা? * কালনাগিনীর ছোবলে বাংলাদেশ * বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় * আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী * না বলা কিছু কথা

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles