অ্যাড. এম.মাফতুন আহমেদ
ইতিহাস কখনো চাপা থাকে না। সময়ের ব্যবধানে সে নিজেই মুখ খোলে।
সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নেত্রী
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী
র একটি বক্তব্য বাংলাদেশে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। তিনি বলেছেন,
১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য নয়, বরং পাকিস্তানকে দুর্বল করার রাজনৈতিক-কৌশলগত কারণেই ভারত মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিল
।
এই একটা বাক্য ৫৪ বছর আগের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়।
১৯৭১ সালে যখন দেশ উত্তাল, তখন এদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতা— যাদের মধ্যে
গোলাম আযম এবং খান-এ-সবুর
ও ছিলেন— একটি আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল,
এই যুদ্ধ যদি পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ একটি নতুন আধিপত্যের শিকারে পরিণত হবে
।
তাঁরা ভয় পেয়েছিলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে নয়, বরং প্রভাব-বলয়ের একটি “কলোনি” হিসেবে দেখবে।
বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য নয়, বরং পাকিস্তানকে দুর্বল করতে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল![]()
১৯৭১ এ ভূ-রাজনৈতিক আশঙ্কার কথা বলা নেতা_
খুলনার সোনার ছেলে, বাঙালির প্রতি অপরিমেয় দুর্বলতার কথা বলতেন_
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা কি সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখছি না?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণে বেশ কিছু বিষয় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সীমান্তে অকারণ গুলি ও হত্যা
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ,
সাম্প্রদায়িক উসকানি
সীমান্ত অঞ্চলে “মাদকের কারখানা” গড়ে উঠার তথ্য, এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার নানা পাঁয়তারা— এগুলো কোনো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল ১৯৭১ এর রক্তের ঋণের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সম্পর্ক চলে স্বার্থের হিসেবে। আবেগ দিয়ে কূটনীতি চলে না।
বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষী, কোনো বড় রাষ্ট্রই তার ছোট প্রতিবেশীকে সমান মর্যাদা দেয় না, যদি না সেই ছোট রাষ্ট্র মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আজ ভারত শুধু বাংলাদেশ নয়, তার আশেপাশের প্রায় সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথেই সম্পর্কে টানাপোড়েনে জড়িয়েছে। প্রশ্ন ওঠে— বন্ধু রাষ্ট্রের সংজ্ঞা তবে কী?
গোলাম আযম এবং খান-এ-সবুরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু ১৯৭১ এর ভূ-রাজনীতি নিয়ে তাঁদের করা একটি পর্যবেক্ষণ আজ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় না। ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে আগাতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণ যুদ্ধ করেছে স্বাধীনতার জন্য। কোনো রাষ্ট্রকে দুর্বল করার প্রক্সি যুদ্ধের জন্য নয়। তাই আজকের বাংলাদেশের দাবি একটাই— সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা, সীমান্তে শান্তি, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, এবং সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ।
১৯৭১ শেষ হয়নি। তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব এখনো চলছে। সময় এসেছে সেই হিসাব চোখে চোখ রেখে বোঝা।




